নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংক খাতের বড় ঋণখেলাপি ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১২টি দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বা বেনামে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও আদালতনির্ভর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পদ উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া ৩৮টি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকে বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতি ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরাও এতে অংশ নেন। যেসব ব্যাংক এখনো আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেনি, তাদের দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজ বিশ্লেষণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকায় এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপসহ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম রয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা সম্পদ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের কার্যক্রমে আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে কার্যক্রম
বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে আগাম অর্থ ব্যয় করতে হবে না। ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে পুরো কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিকভাবে নিজেদের খরচে সম্পদ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পরে উদ্ধার হওয়া সম্পদের নির্ধারিত অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, সম্পদ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান ও আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরবর্তী ধাপে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জব্দ করা সম্পদ বিক্রি বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করা হবে। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং শীর্ষ কয়েকটি বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌথ তদন্ত শুরু হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিআইসি, সিআইডি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত কার্যক্রমে দেশে-বিদেশে তাদের প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এবার দ্বিতীয় ধাপে ৪২টি বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়ে একই ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে এমন অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে এনে খেলাপি ঋণের চাপ কমানো এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।







Leave a Reply