রয়েল ফুটওয়্যার পিএলসির IQIO প্রসপেক্টাসে এমন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি পাওয়া গেছে যা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা এবং তথ্য স্বচ্ছতার সাথে সরাসরি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের SME ও QIO প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলির সুশাসনমান নিয়ে এই অনুসন্ধান থেকে উদ্ভূত প্রশ্নগুলি শুধু রয়েল ফুটওয়্যারের একটি বিষয় নয়—বরং পুরো SME বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ case study।
স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন: প্রসপেক্টাসে দ্বিমুখী বক্তব্য
প্রসপেক্টাসের একটি অংশে (“Certain Relationships and Related Transactions”) সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন (Related Party Transaction) নেই। অথচ একই প্রসপেক্টাসের সংযুক্ত নিরীক্ষিত হিসাবের Note 30.00-তে কোম্পানি নিজেই স্বীকার করেছে যে তারা Al-Madina Pharmaceuticals এবং Smart Shoes Limited-এর সাথে মোট ৯৩ লাখ টাকার লেনদেন পরিচালনা করেছে। এটি কোনো বাইরের অভিযোগ নয়—এটি একই দলিলের দুই অংশের মধ্যে সরাসরি আত্মবিরোধিতা, যা যে কেউ পাশাপাশি পড়লেই বুঝতে পারবেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে IQIO-এর ক্ষেত্রে Corporate Governance Code প্রযোজ্য নয়। এই অবস্থান যদি বৈধ হয়, তাহলে এটি শুধু একটি কোম্পানির প্রশ্ন নয়—বরং SME প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত এবং ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া শত শত কোম্পানির জন্য একটি নিয়ন্ত্রক দিকনির্দেশনা।
ঋণ বৃদ্ধি ও মজুদ পণ্যের অস্বাভাবিক প্যাটার্ন
গত তিন বছরে (২০২৩-২০২৫ জুন) রয়েল ফুটওয়্যারের মোট ঋণ প্রায় ৮৭% বেড়েছে (৩৭.০৯ কোটি থেকে ৬৯.৫১ কোটি টাকা), অথচ একই সময়ে সম্মিলিত নিট মুনাফা মাত্র ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ দেয়নি, ফলে মুনাফা সম্পূর্ণভাবে কাগজে-কলমেই থেকে গেছে। প্রকৃত নগদ অর্থ চলে গেছে ইনভেন্টরি বৃদ্ধিতে—একই সময়ে ৩৮ কোটি টাকা।
আরও চমৎকারী তথ্য হলো, মজুদ পণ্য ২০২১ সালে মাত্র ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ছিল, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়—প্রায় ১৭ গুণ বৃদ্ধি। একই সময়ে রাজস্ব বেড়েছে মাত্র ৬৮%। এই বিসম্বন্ধ একটি উদ্বেগজনক স্বচক্রায়িত ধরনকে নির্দেশ করে: ঋণ নাও → কাঁচামাল কেনো → মজুদ বাড়াও → কাগজে মুনাফা দেখাও → নগদের অভাবে আবার ঋণ নাও।
প্রসপেক্টাসের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী কোম্পানির ইনভেন্টরি টার্নওভার রেশিও ২০২২-এ ১০.৪৯ ছিল, যা ২০২৫-এ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে এসেছে ১.৫০-তে (শিল্প গড় ১.৮০ বা তার নিচে)। এই দ্রুত হ্রাস নির্দেশ করে যে মজুদ পণ্য অত্যন্ত কার্যকরভাবে বিক্রি হচ্ছে না এবং দীর্ঘদিন গুদামে আটকে থাকছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স: নিয়ন্ত্রক সম্মতির প্রশ্ন
প্রসপেক্টাসের পৃষ্ঠা ২১-এর লাইসেন্স তালিকা থেকে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। পরিবেশ সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছিল ১০ জানুয়ারি ২০২৬, অথচ প্রসপেক্টাস স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১০ জুন ২০২৬—অর্থাৎ পাঁচ মাস পর।
এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আরও পাঁচটি অপরিহার্য লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছিল ৩০ জুন ২০২৬-এ: ট্রেড লাইসেন্স, এক্সপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফায়ার লাইসেন্স এবং LFMEAB সদস্যপদ। এই লাইসেন্সগুলি বিহীন রপ্তানিমুখী কোম্পানির বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
এই মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থাকে প্রসপেক্টাসে অন্য সকল বৈধ লাইসেন্সের পাশে স্বাভাবিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, কোনো স্পষ্টীকরণ ছাড়াই। এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকারান্তরে ভুল তথ্য প্রদান করার সামিল।
একক গ্রাহকের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা: চুক্তিবিহীন অবস্থায়
সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রকাশ হলো যে কোম্পানির মোট বিক্রয়ের ৮০.২১% আসে মাত্র একটি ক্রেতা—Pointer Investment (H.K.) Ltd-এর কাছ থেকে (মূল্য ৪২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা)। এরপরই প্রসপেক্টাসে স্পষ্ট করে লেখা আছে: “The Company has no such contract with any supplier or customer”—অর্থাৎ সরবরাহকারী বা ক্রেতার সাথে কোনো লিখিত চুক্তি নেই।
এটি একটি অসম্ভব স্থিতিতে সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ কাস্টমস (NBR)-এর নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানির জন্য কমপক্ষে Export L/C, Export Contract বা Purchase Order থাকতে হয়। এতবড় পরিমাণে নিয়মিত রপ্তানি হয়ে থাকলে এই নথিগুলি অবশ্যই থাকা দরকার ছিল।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি এই ক্রেতা কোনো কারণে অর্ডার দেওয়া বন্ধ করে, তাহলে কোম্পানির ৮০% ব্যবসা এক রাতে বিপন্ন হতে পারে। এই তথ্য সম্পূর্ণভাবে material information যা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয়।
সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন: নেভিপিএস কৃত্রিম বৃদ্ধি
আইপিওর মাত্র দুই মাস আগে (১৮ মে ২০২৬) কোম্পানি তার জমি ও ভবন পুনর্মূল্যায়ন করে প্রায় ৩৯ কোটি ৮২ লাখ টাকার পুনর্মূল্যায়ন সঞ্চিতি তৈরি করে। এর ফলে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (NAVPS) পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া ১৫.৭৮ টাকা থেকে পুনর্মূল্যায়নসহ ২৭.৫৪ টাকায় চলে যায়—প্রায় ৭৫% বৃদ্ধি।
এটি মূলত কাগজে কোম্পানির বুক ভ্যালু বাড়ানোর একটি কৌশল, যা প্রকৃত নগদ আয় বা মুনাফা বৃদ্ধির মাধ্যমে নয়। তালিকাভুক্তির এত কাছাকাছি সময়ে এই পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর মতো মনে হয়।
| আর্থিক বছর | মোট ঋণ (কোটি টাকা) | নিট মুনাফা (কোটি টাকা) | মজুদ পণ্য (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ২৭.৮২ | ১.৮৭ | ৩.৫৫ |
| ২০২২ | ৩৪.৮৭ | ১.২১ | — |
| ২০২৩ | ৩৭.০৯ | ২.৩৬ | — |
| ২০২৪ | ৪৯.৫১ | ৬.৭১ | — |
| ২০২৫ জুন | ৬৯.৫১ | ৫.৩৯ | ৬১.৫৫ |
প্রসপেক্টাসে উপস্থাপিত এই তথ্যগুলি নিয়ে প্রশ্ন এবং স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। BSEC-এর দায়িত্ব হলো এই বিষয়গুলি নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কোম্পানি, নিরীক্ষক এবং ইস্যু ম্যানেজারদের কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া।
বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, তথ্য স্বচ্ছতা এবং পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা বজায় রাখা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। রয়েল ফুটওয়্যার ও অন্যান্য কোম্পানির প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত এই ধরনের অসংগতিগুলি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়—বরং পুরো SME ও QIO প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ নীতির কঠোরতা এবং প্রয়োগের প্রশ্ন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ ও সংস্কারের দিকনির্দেশনা








Leave a Reply