দেশের বীমা খাতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এর মালিকানাধীন সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সম্পদ দেখানো হয়েছিল ৪৬১ কোটি টাকার বেশি, অথচ এর বড় অংশ বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয়। বিপরীতে গ্রাহকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি টাকার বেশি, এবং এই দায় মেটানোর মতো নগদ অর্থও কোম্পানির লাইফ ফান্ডে নেই। এমন আর্থিক পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো।
সানলাইফের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ১৯ হাজার ৩০৫টি শেয়ার কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, প্রতি শেয়ার ৫০ টাকা দরে, যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ৭৭ কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া গ্রিন ডেল্টার পাঁচটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরও ৩৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ শেয়ার কেনে, এবং বাকি ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ শেয়ার নেন সিইও ফারজানা চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠানের ৮ জন কর্মকর্তা।
সানলাইফের সম্পদ: হিসাবে আছে, বাস্তবে নেই
শেয়ার কেনার সময় সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের সম্পদ দেখানো হয়েছিল ৪৬১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৬৩ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ৩৩৮ কোটি টাকার বেশি, ছিল বকেয়া ও ল্যাপস (মেয়াদোত্তীর্ণ) পলিসির প্রিমিয়াম বাবদ, যা বাস্তবে আদায়যোগ্য নয় কারণ সংশ্লিষ্ট সব পলিসি ইতোমধ্যে ল্যাপস হয়ে গেছে। বিটিএ টাওয়ারের একটি ফ্লোরের হিসাবি মূল্য অবচয়ের কারণে শূন্য হয়ে যাওয়ার পরও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ১৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়। আয়কর অগ্রিম বাবদ ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ও পিপলস লিজিংয়ে থাকা ১ কোটি টাকাও ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে কোম্পানির প্রকৃত সম্পদ দাঁড়ায় মাত্র ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যেখানে মোট দায় ৩৬৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ২৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
| বিবরণ | দেখানো মূল্য (টাকা) | প্রকৃত অবস্থা |
|---|---|---|
| বকেয়া/ল্যাপস প্রিমিয়াম | ৩৩৮ কোটি ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৯২ | আদায়যোগ্য নয় |
| বিটিএ টাওয়ার ফ্লোর (পুনর্মূল্যায়িত) | ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫২০ | নগদায়নযোগ্য নয় |
| আয়কর অগ্রিম | ৬ কোটি ৬০ লাখ ১ হাজার ৬৯৭ | ফেরতযোগ্য নয় |
| পিপলস লিজিং | ১ কোটি | আদায়ের সম্ভাবনা নেই |
| প্রকৃত সম্পদ (মোট) | ১০১ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার ৩৫৪ টাকা | |
| মোট দায় | ৩৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৮ টাকা | |
| ঘাটতি | ২৫৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৪ টাকা | |
গ্রিন ডেল্টার তহবিল থেকে ৮৫০ কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ
সানলাইফ অধিগ্রহণের পাশাপাশি গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স-এর নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন ও বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কারসাজি ও হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল থেকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন দেখিয়ে ইক্যুইটি বৃদ্ধির মাধ্যমে সরানো হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বেআইনিভাবে অন্য খাতে অগ্রিম বাবদ দেখানো হয়েছে ২২৫ কোটি টাকা, অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে ১৭১ কোটি টাকা, এবং মুনাফা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে ২৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, মালিকানা হস্তান্তরের আগে ইস্যু করা সব পলিসির দায়ভার বর্তমান পর্ষদের ওপর বর্তায়, কিন্তু গ্রাহকদের বকেয়া বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় একাধিক মামলা হয়েছে। গ্রিন ডেল্টার সিইও ফারজানা চৌধুরী এবং কোম্পানি সচিব মো. ওলিউল্লাহ খান — উভয়েই জাগো নিউজের প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, ফলে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রান্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য জরুরি পরিভাষা
- রিভ্যালুয়েশন রিজার্ভ (পুনর্মূল্যায়ন রিজার্ভ): কোনো স্থায়ী সম্পদের বাজারমূল্য বৃদ্ধি দেখিয়ে হিসাবে যে অতিরিক্ত মূল্য যোগ করা হয়, বাস্তবে যা নগদ অর্থ নয়।
- ল্যাপস পলিসি: নির্ধারিত সময়ে প্রিমিয়াম না দেওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ বা বাতিল হয়ে যাওয়া বীমা পলিসি।
- ইক্যুইটি: কোম্পানির মোট সম্পদ থেকে মোট দায় বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, অর্থাৎ প্রকৃত মালিকানার মূল্য।
- লাইফ ফান্ড: জীবন বীমা কোম্পানির সেই তহবিল যা থেকে গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স-এর মাধ্যমে সানলাইফ অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নিজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনা — উভয় ক্ষেত্রেই বড় আকারের আর্থিক গরমিলের অভিযোগ পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উভয় কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের এই অনিয়মের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ ও আর্থিক প্রতিবেদনের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনের তথ্য জাগো নিউজের অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত। বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) কর্তৃক আনুষ্ঠানিক তদন্তাধীন কি না তা প্রকাশনার আগে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: [বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ হারানোর শীর্ষে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স]







Leave a Reply