২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারে কর সুবিধা সংক্রান্ত একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে তিনি জানান, নতুন প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, করপোরেট সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ ৭.৫ শতাংশ কর ছাড়
অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত প্রস্তাবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর ছাড়ের পরিধি বাড়ানো। এখন থেকে যেকোনো পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হলেই কোম্পানি ২.৫ শতাংশ কর ছাড় পাবে। এছাড়া আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব — অর্থাৎ কোম্পানির শেয়ার প্রথমবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রক্রিয়া), ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু বা রিপিট পাবলিক অফারের মাধ্যমে কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে অফলোড করলে আরও ২.৫ শতাংশ কর ছাড় পাওয়া যাবে।
একইসঙ্গে, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত উভয় ধরনের কোম্পানি সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করলে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ কর সুবিধা পাবে। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার বাজারে অফলোড করার পাশাপাশি সম্পূর্ণ ক্যাশলেস লেনদেন নিশ্চিত করলে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় তাদের করহার সর্বোচ্চ ৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।
| শর্ত | কর ছাড়ের হার |
|---|---|
| স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি | ২.৫% |
| আইপিও/রাইট ইস্যু/RPO-তে ন্যূনতম ১০% শেয়ার অফলোড | ২.৫% |
| সম্পূর্ণ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন (ক্যাশলেস) | ২.৫% |
| সর্বোচ্চ মোট ছাড় | ৭.৫% |
লভ্যাংশ আয়ের কর কমলো, মিউচ্যুয়াল ফান্ডে সীমা উঠে গেলো
বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে লভ্যাংশ আয়ের কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি করদাতাদের ক্ষেত্রে লভ্যাংশ আয়ের করহার কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ-এ নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
এছাড়া মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগ সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে বাজেটে। এতদিন কর রেয়াত পাওয়ার জন্য মিউচ্যুয়াল ফান্ডে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সীমা ছিল, যা এখন তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও উচ্চমূল্যের বিনিয়োগকারীরা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে আরও বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন, যা বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হবে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব হলো, জিরোকুপন বন্ড (যে বন্ডে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সুদ দেওয়া হয় না, বরং মেয়াদ শেষে ছাড়মূল্যে কেনা বন্ডের পূর্ণ অভিহিত মূল্য পরিশোধ করা হয়) থেকে প্রাপ্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা। এতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়ন ও বন্ডবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: সুশাসন নিশ্চিতই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজার সূচকের ঊর্ধ্বগতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং এ খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোষিত প্রণোদনাগুলো বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির আগমন বাড়বে, বাজার মূলধন সম্প্রসারিত হবে এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী হবে। তবে তাদের মতে, শুধু কর-সুবিধা নয় — বাজারে সুশাসন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে, দীর্ঘদিন পর বাজেটে এত বিস্তৃত পরিসরে পুঁজিবাজারে কর সুবিধা ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে, যা আগামী দিনে বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন: [সম্পর্কিত নিউজের শিরোনাম লিখুন]







Leave a Reply