ইরান যুদ্ধ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ট্রাম্পের ভাষণ, হরমুজ প্রণালি, ইরান ইসরায়েল, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মাসুদ পেজেশকিয়ান, মোজতাবা খামেনি
Amader Pujibazar আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে মাত্র ২০ মিনিটের ভাষণ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই ভাষণে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় তীব্র সমালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি একজন পরিকল্পনাহীন নেতার বক্তব্য ছাড়া আর কিছু নয়।
ভাষণে নতুনত্বের অভাব: বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি জানান, ভাষণে কোনো মূল বক্তব্য খুঁজে পাননি তিনি। বরং গত ৩০ দিনে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে যা লিখেছেন, তারই কালানুক্রমিক পুনরাবৃত্তি ঘটেছে এই ভাষণে।
কোয়েন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক ত্রিতা পার্সি আরও কঠোর মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ভাষণে কোনো নতুন বিষয় না থাকাটাই প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের কাছে আসলে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কৌশলগত শূন্যতা স্পষ্ট করে দেয় যে হোয়াইট হাউজ যুদ্ধ শেষ করার কোনো বাস্তব কূটনৈতিক বা সামরিক রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেনি। ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলা ট্রাম্পের ‘জয়ের’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
জনমত ট্রাম্পের বিপক্ষে, নিজের ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন কমছে
ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার হুমকি এবং মার্কিন সেনা হত্যার অভিযোগ তুলে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন চাইলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ইয়োগাভ জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ সমর্থন করেন। রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে এই হার বর্তমানে ৬১ শতাংশ, যা চলতি বছরের ২ মার্চে ছিল ৭৬ শতাংশ।
যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। ত্রিতা পার্সির ভাষায়, ট্রাম্পের নিজের সমর্থকরা এখন গ্যাস স্টেশন ও মুদির দোকানে এই যুদ্ধের মাশুল দিচ্ছেন।
কূটনীতির অনুপস্থিতি: যুদ্ধ থামানোর পথ বন্ধ?
ভাষণে কূটনীতি বা আলোচনার কোনো উল্লেখ না থাকাটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে বিশ্লেষকদের। গত কয়েক দিন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের ‘নতুন প্রেসিডেন্ট’ যুদ্ধবিরতি চাইছেন এবং আলোচনা চলছে। তবে ইরান বারবার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। উল্লেখ্য, মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০২৪ সাল থেকেই ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভাষণে কূটনীতির উল্লেখ না থাকা ইঙ্গিত দেয় হয় আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, নয়তো ট্রাম্পের আগের দাবিগুলো ছিল ভিত্তিহীন। কেবল সামরিক হুমকির ওপর নির্ভর করে কার্যত যুদ্ধ শেষ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ দাবি, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন
ট্রাম্প দাবি করেছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ কমান্ডারদের মৃত্যুর পর ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটে গেছে। কিন্তু ন্যাশনাল ইরানি আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, ট্রাম্প শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারেননি; বরং ইসলামি শাসনের সবচেয়ে কট্টর অংশটিকে আরও পাকাপোক্ত করেছেন।
বাস্তবে খামেনির পুত্র মোজতাবা খামেনি নতুন নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুদ্ধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই ইরান ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করেছে, যা প্রমাণ করে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো অটুট।
জ্বালানি সংকট ও মিত্রদের ওপর দায় চাপানো
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে ট্রাম্প সমাধান হিসেবে বলেছেন, উপসাগরীয় তেলনির্ভর দেশগুলো যেন নিজেরা হরমুজ প্রণালি রক্ষা করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফাভাবে যুদ্ধ শুরু করে এখন সেই সংকট সামলানোর দায়িত্ব মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপানো কূটনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানের প্রকাশ।
বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি: আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
ভাষণে ট্রাম্প আবারও ইরানের বৈদ্যুতিক গ্রিড ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা নিষিদ্ধ। পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরান জানিয়েছে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করা হবে।
সিনা আজোদি এই পরিস্থিতিকে ‘নিয়মতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৃত্যু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই যুদ্ধ আর কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; একটি সর্বগ্রাসী সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
উপসংহার: বিজয়ের দাবি, বাস্তবে অনিশ্চয়তা
এই ভাষণের মাধ্যমে ট্রাম্প যুদ্ধে ‘জয়’ ঘোষণা করে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই যুদ্ধের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটি এখনই বলা কঠিন।







Leave a Reply