নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকিং খাতে এক নজিরবিহীন ও বিরল পদক্ষেপ নিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এসএস স্টিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান জাভেদ ওপেনহেফেনের বনানীর বাসভবনটি ১১২ কোটি ৪১ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নিজেদের দখলে নিয়েছে ব্যাংকটি। আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে এই সম্পদটি এখন ব্যাংকের আইনি দাবির অধীনে রয়েছে।

গত সোমবার (১৬ মার্চ) জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ক্রোক করা সম্পত্তির ছবিসহ জনগণকে এই বাড়িটি কেনা বা কোনো প্রকার লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

ইস্টার্ন ব্যাংক ঢাকা মানি লোন কোর্টে মামলা করার পর আদালত এই ক্রোকের আদেশ দেন। গত ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উক্ত সম্পত্তিতে ব্যাংকের দাবি উল্লেখ করে সাইনবোর্ড স্থাপনেরও নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এসএস স্টিল ও এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। ফলে বাধ্য হয়েই ব্যাংক আদালতের আশ্রয় নেয়।

ইস্টার্ন ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “ঋণগ্রহীতা ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় আদালতের আদেশে আমরা এই পদক্ষেপ নিয়েছি। জনস্বার্থে এবং এই সম্পদ যেন কেউ না কেনে, সেজন্যই ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।”

জানা গেছে, এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ব্যাংকটি ঋণের বিপরীতে জামানত রাখা বিভিন্ন সম্পদ নিলামে তোলার চেষ্টা করেছিল। এর মধ্যে ছিল কারখানার যন্ত্রপাতি, বনানীর চার তলা ভবনসহ ৫ কাঠা জমি এবং জাভেদ ও তার স্ত্রীর নামে থাকা এসএস স্টিল, ফু-ওয়াং সিরামিক ও সালেহ স্টিলসহ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় ব্যাংক এখন সম্পত্তিটি সরাসরি ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এসএস স্টিলের আর্থিক অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক। ইস্টার্ন ব্যাংক ছাড়াও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (২৯০ কোটি টাকা) এবং ব্যাংক এশিয়া (১৬৮ কোটি টাকা) তাদের খেলাপি ঋণ উদ্ধারে গত অর্থবছরে নিলাম ডাকলেও কোনো ক্রেতা খুঁজে পায়নি। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১১৩ শতাংশ বেশি।

আর্থিক সংকটের কারণে কোম্পানিটি সময়মতো ডিভিডেন্ড প্রদানেও ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ২০২৪ অর্থবছরের জন্য ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড অনুমোদন করা হয়েছিল, কিন্তু তা ঠিকমতো বিতরণ না করায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে। এছাড়া ২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমাও কোম্পানিটি পার করে ফেলেছে, যা বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সবশেষ তথ্যানুযায়ী, এসএস স্টিলের দেনার পরিমাণ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির চেয়ে প্রায় ২৫১ শতাংশ বেশি। ঋণের এই বিশাল বোঝার মধ্যেও গত অর্থবছরে কোম্পানিটি ৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। তবে খেলাপি ঋণের দায়ে চেয়ারম্যানের বাড়ি ক্রোক হওয়ার খবরটি এখন শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

S

Sadat Hossain Sadman

View all posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *